শূন্য / Zero

 

                                     

শূন্য মানে কী

শূন্য মানে ‘কিছু না

শূন্যের কোনও মূল্যও নেই

অথচ এই মূল্যহীন শূন্য ছাড়া আমরা অচল। আবার শূন্যই একটি গাণিতিক সংখ্যা যা সাধারন ভাষায় এটিকে নম্বর বলা যেতে পারে।  তিন থেকে তিন বিয়োগ করলে আমরা শূন্য পাই। যেমন ১ মানে একটি জিনিস২ মানে দুটি জিনিসকিন্তু শূন্য মানে  কিছু না। সেই কিছুই না থেকে আবার অনেক কিছুর উৎপত্তি  অর্থাৎ সেই ‘কিছুই না’ একটি সংখ্যা হতে পারে। যা নেই তা আবার সংকেত দিয়ে প্রকাশ করার কী দরকারশূন্যের কোনো প্রয়োজন নেই। তবে এটি যদি কোনও সংখ্যার কাছে আসে তবে এর মান দশগুণ বৃদ্ধি পায়যেমন 1 এর পরে শূন্য বসালে তখন 10 হয় এবং 10 এর পরে শূন্য বসালে তখন ১০০ হয়,  তবে শূন্যটি যদি কোনও সংখ্যার প্রথমে স্থাপন করা হয়তখন সংখ্যার মান হ্রাস বা বৃদ্ধি হয় না।  যেমন ৯৯ এর আগে বসালে মানের কোন পরিবর্তন হয় না। যদি শূন্য একটি সংখ্যা দ্বারা গুণ করা হয় ( যেমন ৯৯ x 0 = 0) তবে কেবল 0 টি আসবে 

এখন প্রশ্ন হতে পারে শূন্য কি একটা জোড় সংখ্যা ? অবশ্যই জোড় সংখ্যা,  কারন - 

আমরা জানি, যে সকল সংখ্যা ২ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য তাদেরকে জোড় সংখ্যা বলে। শূন্য, ২ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। অর্থাৎ, 0 কে দুই দ্বারা ভাগ করলে কোন ভাগশেষ থাকে না,  ভাগশেষ শূন্য (0) 

 আবার, সকল জোড় সংখ্যাকে 2n দ্বারা প্রকাশ করা যায়, এবং শূন্যের ক্ষেত্রে সেখানে n=0 সুতরাং আমরা বলতে পারি শূন্য একটা জোড় সংখ্যা।

 

0টি যদি একটি সংখ্যায় বিভাজিত হয় তবে উত্তরটি কী হবে?

কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে তা অসংজ্ঞায়িত হয় – কারন

 

 

তোমার কাছে ৬ টি কলম আছে। এখন কলমগুলো ৩ জনের মাঝে ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে 2টি করে কলম পাবে। ৬ জনের মাঝে ভাগ করলে প্রত্যেকে একটি পাবে। ছয়টি কলম শূন্যজনের মাঝে ভাগ করা হলে প্রত্যেকে কয়টি পাবে? অসম্ভব ব্যাপার। এখানে শূন্যজন মানে হল কলম দেওয়ার মত কেউ নেই। যেখানে কলম ভাগ করা হবে সেখানে শূন্যজন মানে বিতরণই হবে না। তাই ভাগফলও পাওয়া যাবে না। 

 

আবার মনে কর, ১০০ কে ২৫ দিয়ে ভাগ করলে ৪ পাই। এ দ্বারা বোঝায় ১০০ সংখ্যাটি পেতে ৪ টি ২৫ লাগবে।

৩০/৬ = ৫ বলতে বোঝায় ৩০ সংখ্যাটি পেতে ৫ টি ৬ লাগবে।

এখন যদি আমরা ১০ কে শূন্য (0) দ্বারা ভাগ করি (১০/০) তবে অর্থ দাঁড়ায় ১০সংখ্যাটি পেতে কতটি শূন্য লাগবে?

আমরা হাজার কিংবা লক্ষ কোটি শূন্য যোগ করেও ১০বানানো যাবে না।

অর্থাৎ কোন সংখ্যা যত বড় বা ছোট হোক না কেন শূন্য দ্বারা ভাগ করলে কোন অর্থ প্রকাশ করে না। এটা অবাস্তব বা অসম্ভব । এই অবাস্তব বা অসম্ভব বিষয়গুলোকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না বলে গণিতে একে অসংজ্ঞায়িত বলা হয়।

 '0' (শূন্যকে সাহায্যকারী অঙ্ক বলা হয় নিজের কোন মান নেই ইংরেজিতে জিরো (zero) শব্দটি এসেছে ভেনিশিয় শব্দ জিরো (zero) থেকে । ভেনিশিয় শব্দ জিরো (zero) আবার ইতালিয় জিফাইরো (zefiro জেফিরোথেকে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। ইতালীয় জিফাইরো শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ "সাফাইরবা "সাফাইরাথেকে যার অর্থ "সেখানে কিছু ছিল না" এই শব্দটি প্রথমে ভারতীয় সংস্কৃত শ্যুন্যোয়া শব্দ হতে অনুদিত হয়েছে। সংস্কৃত শব্দ শ্যুন্যেয়া (শ্যূন্যযার অর্থ খালি বা ফাঁকা।

শূন্য উদ্ভাবনের বিষয়টি সাথে সাথেই আমাদের মনে প্রশ্ন আসে এই রহস্যময় শূন্যের উৎপত্তি কি করে এবং কিভাবে হল? আর কে প্রথম শূন্য ব্যবহার করেছেএই আজকে আমরা শূন্যের ইতিহাসের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

,০০০-,০০০ বছর আগে সুমেরীয়রা প্রথম গণনা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু করে। তাদের গণনা ব্যবস্থায় শূন্যকে খালি জায়গা’ হিসেবে ব্যবহার করা হত। খালি জায়গা মানে শূণ্য। সংখ্যার মাঝে এই খালি জায়গা রাখার বিষয়টি থেকে প্রথম শূন্যের ধারণা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এই গণনা ব্যবস্থা ব্যাবিলনীয়রা গ্রহণ করে। ব্যাবিলনীয়রা সুমেরীয়দের থেকে প্রাপ্ত কিউনিফর্মে লিখতো। তারা শুধুমাত্র খালি জায়গা না রেখে ব্যাবলনীয়রা এবার শূন্যকে একটু ভিন্ন মাত্রা প্রকাশ করল। তারা শূন্য বোঝানোর জন্য ২টি কোণাকৃতির (‘’) চিহ্ন ব্যবহার করা শুরু করে।  ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দদের দিকে ব্যাবিলনের কোথাও কোথাও ১টি কোণাকৃতির (‘) চিহ্নকেও শূন্য ধরা হত।  ব্যাবিলনীয় সভ্যতা স্থানধারক হিসাবে  কিছু প্রতীক ব্যবহার করেছিল। এই স্থানধারকটি ১০ ​​এবং ১০০ এবং ২০২৫ এর মতো সম্পূর্ণ সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

 ব্যাবিলনীয় সভ্যতার পরে মায়ানো 0 টি স্থানধারক হিসাবে ব্যবহার শুরু করে। এটি প্যানেল সিস্টেম তৈরিতে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। তবে  কখনই গণনায় 0 ব্যবহার করে নি। এর পরেভারতের নামটি এসেছে যেখানে থেকে আজ 0 আকারে এসেছিল। সর্বপ্রথম ভারতীয় উপমহাদেশের আর্যভট্ট (৪৭৫-৫৫০ খ্রিঃ) '' (শূন্যপ্রথম ধারণা দেন ব্রক্ষ্মগুপ্ত (৫৯৮-৬৬৫ খ্রিঃশূন্য আবিষ্কার করেন এবং এই শূন্যকে ব্যাপক ভাবে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে আসেন

ভারতের জনপ্রিয় গণিতবিদ এবং জ্যোতিষী আর্যভট্টই প্রথম ব্যক্তি যিনি শূন্য সম্পর্কে ধারণাটি দিয়েছেন। আর্যভট্ট বিশ্বাস করতেন যে এমন একটি সংখ্যা থাকা উচিত যা দশ-অঙ্কের প্রতীক হিসাবে দশটি এবং একক অঙ্ক হিসাবে শূন্যকে (কোনও মূল্য ছাড়াইউপস্থাপন করতে পারে। অর্থাৎআর্যভট্ট শূন্য ধারণাটি দিয়েছেন এবং তারপরে ষষ্ঠ শতাব্দীতে 0 নীতিটি দিয়েছেন।  

আর্যভট্ট ব্রহ্মগুপ্ত ছাড়াও অন্য এক ভারতীয় গণিতবিদ, যার নাম ছিল শ্রীধরাচার্য। শূন্য আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তার অনেক অবদান আছে, যা অস্বীকার করা যায় না। তিনি ৮ ম শতাব্দীতে ভারতে শূন্যের ক্রিয়াকলাপ আবিষ্কার করেছিলেন এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাখ্যা করেছিলেন।

যদি শূন্য আবিষ্কার না করা হত তবে আজ গণিত কেমন হত -  এটা বলার প্রয়োজন নাই। গণিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে শূন্যের অবদান আছে। এটিকে গণিতের অন্যতম বৃহৎ আবিষ্কার হিসাবে গণ্য করা হয় এবং এই আবিষ্কারকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

ফারহা দিবা

সিনিয়র ইন্সট্রাকটর

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যাথমেটিক্স

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট

 

Comments

Sign in to comment