আইনস্টাইনের চোখ ও মস্তিষ্ক চুরি ! / Stealing Einstein's eyes and brain

 

 

আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক চুরি হয়েছিল এবং ছোট টুকরো টুকরো টুকরো হয়ে গেছে বিজ্ঞানের জন্য · 65 বছর পূর্বে আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক চুরি , সংরক্ষণবিচ্ছিন্ন  প্রেরণ করা হয়েছিল দেশ জুড়ে টুকরো টুকরো করে। আজকে লিখছি ইতিহাসের অন্যতম শেষ্ঠ ব্রেইনআলবার্ট আইন্সটাইনের ব্রেইন নিয়ে।

 

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই বিশ্বনন্দিত E=mc2 সূত্রটি প্রবর্তন করেন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মেধাবী মানুষগুলোর একজন। তাই তাঁর ব্রেইন ছিলো সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক বিস্ময়ের বিষয়। ১৮ই এপ্রিল১৯৫৫ সালে আইনস্টাইন নিউ জার্সিতে অবস্থিত প্রিন্সটন হাসপাতালে চিরতরে পৃথিবীকে বিদায় জানান। 

আইনস্টাইন চেয়েছিলেন যেন তাঁর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক শবদাহ প্রক্রিয়া পালন করা হয়। তবুও তাঁর মৃত্যুর পর প্রিন্সটন হাসপাতালের প্যাথোলজিস্ট ডঃ টমাস হার্ভিকে আইনস্টাইনের মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। ডঃ হার্ভির কাজ শুধু মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা থাকলেও তিনি কারো পরামর্শ এবং অনুমতি ছাড়াই একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। যে সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনকে প্রভাবিত করেছে হাজার গুণে।

কৌতুহলবশত হোক কিংবা অন্য যে কোন কারণেই হোকতিনি চাননি পৃথিবীরর এত প্রসিদ্ধ একজন মানুষের ব্রেইনকে হাতছাড়া করতে। তাই তিনি আইনস্টাইনের মৃত্যুর সাত-সাড়ে সাত ঘণ্টার মধ্যেই আইনস্টাইনের ব্রেইন মাথা থেকে বের করে ফেলেনএখানে বলে রাখা ভালোডঃ হার্ভি কিন্তু কোন মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। তিনি শুধু একজন প্যাথোলজিস্ট ছিলেন।

মজার ব্যাপার হলো তিনি শুধু ব্রেইনই বের করেই শান্ত হননিসাথে তাঁর দুটি চোখও বের করে নিয়েছিলেনযা প্রিজারভেশন জারে করে পরবর্তীতে আইনস্টাইনের চোখের ডাক্তার ডঃ হেনরি অ্যাব্রামসের কাছে হস্তান্তর করেন। ধারণা করা হয় তাঁর চোখ জোড়া এখনো নিউইয়র্কে কোন সেফটি লকের ভেতর সংরক্ষিত করে রাখা আছে।

আইনস্টাইনের পরিবারের কাছ থেকে ব্রেইন বের করে নেয়ার কাজ করার কোন অনুমতি ডঃ হার্ভির কাছে না থাকায় কাজটি ছিলো সম্পূর্ণ বেআইনি। তাই বিভিন্ন জায়গায় ডঃ হার্ভির করা এই কাজকে সরাসরি চুরি বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি ঠিকই আইনস্টাইনের পরিবারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তিনি ব্রেইন চুরি করেননি। তিনি ব্রেইন বের করে নিয়েছেন বিজ্ঞানের স্বার্থে গবেষণার জন্য!

 

ডঃ হার্ভি ছিলেন প্রথম এবং শেষ ব্যক্তি যিনি ইতিহাসের সব থেকে বিখ্যাত ব্রেইনটি সম্পূর্ণ অবস্থায় হাত দিয়ে ধরেছিলেন। কারণতিনি প্রথমে সম্পূর্ণ ব্রেইনের সব অ্যাঙ্গেল থেকে বেশ কিছু ছবি তুলে নেন এবং তারপর ব্রেইনটিকে ভাগ করে ফেলেন ২৪০টি ব্লকেপরবর্তীতে ব্রেইনের আলাদা আলাদা অংশের কথা মাথায় রেখে এই ব্লক থেকে এক হাজারেরও বেশি স্লাইড তৈরি করেন তিনি। এরপর এই স্লাইডগুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে বাক্সবন্দী করে পাঠিয়ে দেন পুরো পৃথিবীর নানা দেশের গবেষকদের কাছে। 

 “আইনস্টাইনের ব্রেইন সাধারণ মানুষের থেকে ভিন্ন”-এই রকম হাইপোথিসিসকে পুঁজি করে গবেষণা করা হয়েছে অনেক। আর গবেষণা শেষে হাইপোথিসিসগুলো সত্যি হয়েছে প্রতিবারই। বিশ্বজুড়ে যত গবেষকেরা আইনস্টাইনের ব্রেইনের স্লাইডগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেনতাদের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আইনস্টাইনের ব্রেইনের সাথে সাধারণ মানুষের ব্রেইনের ভিন্নতা চলো দেখে নেই সহজভাবে।

১। সাধারণ মানুষের IQ গড়ে ৯০-১১০ এর মধ্যে থাকলেও আইনস্টাইনের IQ ছিলো ১৬০-১৯০যা কিনা একজন স্বাভাবিক মানুষের তুলনাতে অনেক বেশি। কিন্তু সবথেকে অবাক করার বিষয় হলোতাঁর IQ স্বাভাবিক মানুষের থেকে অনেক বেশি হলেও তার ব্রেইনের সাইজ ছিলো সাধারণ মানুষের ব্রেইনের তুলনায় ছোট।

সাধারণ মানুষের ব্রেইনের ভর যেখানে প্রায়  পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ১৪০০গ্রামসেখানে আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের ভর প্রায় . পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় ১২২৫ গ্রামআসলে আমাদের মাঝে প্রায়শই “বেশি বুদ্ধিমান মানে বড় ব্রেইন নাকি”-এমন ভ্রান্ত ধারণা কাজ করেএখান থেকেই কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যায় যেমেধা কিংবা চিন্তা করার ক্ষমতার সাথে মস্তিষ্কের আকার অথবা ভরের কোনো সম্পর্ক নেই।

২। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ পার্থক্যের মধ্যে একটা হলোআইনস্টাইনের ব্রেইনের ইনফেরিওর প্যারাইটাল অংশ (যা মানুষের ভাষা এবং গাণিতিক দক্ষতাকে নিয়ন্ত্রণ করেস্বাভাবিক মানুষের মস্তিষ্কের তুলনাতে ১৫ শতাংশ বড়অন্যদিকে ব্রেইনের সব থেকে বড় খাদ Sylvian fissure যা কিনা আইনস্টাইনের মস্তিষ্কে প্রায় অনুপস্থিত ছিলো।

৩। সবথেকে বড় পার্থক্য যা আইনস্টাইনের ব্রেইনকে সাধারণের থেকেও বেশি মাত্রাতে নিয়ে গিয়েছে তা হলোআইনস্টাইনের ব্রেইন আসল বয়সের থেকে কম বয়স প্রদর্শন করে। অর্থাৎ তাঁর ব্রেইন তার নিজের বয়সের থেকে আরও কম বয়সীদের ব্রেইনের মতন আচরণ করে। অন্যদিকে আইনস্টাইনের ব্রেইনের নিউরন এবং গ্লিয়াল কোষের অনুপাত একই বয়সে মারা যাওয়া ১১জনের সাথে তুলনা করা হয়েছিলোএবং দেখা যায় এই অনুপাত আইনস্টাইনের ব্রেইনে অনেক গুণে বেশি।

সব কিছু মিলে ধারণা করা হয়তার নিউরনগুলো কাজ করার জন্য যথেষ্ঠ জায়গা পেত যা তার গাণিতিক  স্থানিক চিন্তা শক্তিতে সাহায্য করত। সত্যি কথা বলতেখুব নির্ভুলভাবে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করাও অসম্ভব। আর যদি সেটা করতে হয় তা হলে এর জন্য অধিক সময়ের প্রয়োজন।

ডঃ হার্ভি আইনস্টাইনের ব্রেইনের মোট  বক্স স্লাইড তৈরি করেছিলেনযার মধ্য থেকে একসেট স্লাইড বর্তমানে অমেরিকাতে অবস্থিত “ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ হেলথ অ্যান্ড মেডিসিনে” রয়েছে। ৪৬টি স্লাইড The Mütter Museum- রয়েছে।

আইনস্টাইনের ব্রেইন নিয়ে গবেষণার প্রধান অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা হল পৃথিবীতে আইনস্টাইনের মত জিনিয়াস একজনই ছিলেন বা আছেন।

তাই  গবেষণা আরো বেশী গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য পৃথিবীর বিখ্যাত গণিতবিদদের ব্রেইন সংগ্রহ করে রাখা বলে মনে করেন অনেকে। আইনস্টাইনের মত এরকম বড়মাপের বিজ্ঞানীর মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার ফলাফল হয়তো একসময় সঠিকভাবে বলতে সক্ষম হবে তাঁর চিন্তা শক্তির রহস্য সম্পর্কে। তেমনি মস্তিষ্কের কোন্ অংশ আসলেই বড়মাপের বিজ্ঞানী কিংবা মহাজ্ঞানী হতে সাহায্য করেসে সম্পর্কেও আরও বেশি বেশি জানা সম্ভব হতে পারে।

Source : Google

=======================================

লিখেছেন:

জান্নাতুল ফেরদৌস

ইন্সট্রাক্টর

ডিপার্টমেন্ট অফ ফিজিক্স

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Comments

Sign in to comment