পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প/Padma Multipurpose Bridge

 

হার মানবে না বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পেরেছে, বাংলাদেশ পারবে। 

১৯৯৮ সালে যমুনা সেতুর মাধ্যমে দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও পূর্বাঞ্চলের সরাসরি সড়কপথে সংযুক্ত হয়। তখন যমুনা সেতু ছিল বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু। ঠিক এরপরই পদ্মা নদীতেও সেতু নির্মাণের দাবি ওঠে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলা তখনো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বলতে গেলে ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সেই দাবিটি তাই ছিল যৌক্তিক। কিন্তু তাহলেও কি বললেই পদ্মায় সেতু করা যায়? প্রমত্ত পদ্মাকে বাগে এনে তার বুকে প্রায় ছয় কিলোমিটারের একটি সেতু অবকাঠামো নির্মাণ তো সোজা কথা নয়!

সঙ্গত কারণেই একদিকে যখন দেশের একটি বড় অংশের জনপদের মানুষের স্বপ্নের কল্পনায় ছিল পদ্মাসেতু, তেমনি এটি বাস্তবায়ন নিয়েও ছিল দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা। এরপর সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নিলে তাতেও বাধা-বিপত্তি কম আসেনি। বিশ্বব্যাংক থেকে উঠেছিল দুর্নীতির অভিযোগ। পদ্মাসেতুর অর্থায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে একের পর এক পিলার। তারপর সেসব পিলারের ওপর একে একে বসেছে একেকটি করে স্প্যান। স্বপ্নের সেতুর বাস্তবায়নও এগিয়েছে একটু একটু করে। সবশেষ ৪১তম স্প্যানটি বসে যাওয়ার পর কোটি মানুষের সেই স্বপ্নের সেতুটি আজ (বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর) পেল পূর্ণাঙ্গ সেতুর রূপ। পদ্মার এপার-ওপারের মধ্যেকার সেই সংযোগটি দুই পারকে এনে দিয়েছে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে। ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পূর্ণাঙ্গ পদ্মাসেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, এক নিরেট বাস্তবতা।

 

 

 

পদ্মা সেতুর সুবিধা

পদ্মা সেতু নির্মানের ফলে  দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ টি জেলা রাজধানী ঢাকা সহ অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত হয়েছে।একই সাথে শিল্পায়ন সহ মোংলা ও পায়রা বন্দরের কার্যক্রমে গতি বাড়বে। দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও  অপটিক্যাল ফাইবারের সাহায্যে ইন্টারনেট সুবিধা পাবে।যাতায়তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এর পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধি,কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে এ এইচ-১ এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে এর সাথে সংযুক্ত হওয়ায় এ সেতু নির্মিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়ত ব্যবস্থা সহ দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যাতায়ত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 

 
 

পদ্মা সেতুর প্রতিবছরে সার্বিক প্রভাব

  • দেশের জিডিপি বাড়বে-১.২৩%
  • দক্ষিন ও দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২.৩%
  • দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাড়বে-০.৮৪%

 

 

 

 

 

কী আছে পদ্মা সেতুতে ?

 

  1. পদ্মা সেতুর প্রকল্পের নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প’।

 

  1. পদ্মা সেতুর ধরন দ্বিতলবিশিষ্ট। এই সেতু কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে। (যা বিশ্বে প্রথম)।

 

  1. পদ্মা সেতু নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির নাম চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এর আওতাধীন চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি।

 

  1. পদ্মা সেতুতে থাকবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ পরিবহন সুবিধা।

 

  1. পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপন হচ্ছে স্প্যানের মধ্য দিয়ে।রেল লাইন একটি, ,চলতে পারবে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ উভয়ই।

 

  1. পদ্মা সেতুর প্রস্থ হবে ৭২ ফুট, এতে থাকবে চার লেনের সড়ক। মাঝখানে রোড ডিভাইডার।

 

  1. পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।

 

  1. পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট ৩ দশমিক ১৮ কিলোমিটর।

 

  1. পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক দুই প্রান্তে (জাজিরা ও মাওয়া) ১৪ কিলোমিটার।

 

  1. পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদীশাসন হয়েছে দুই পাড়ে ১২ কিলোমিটার।

 

  1. পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাজ করছে প্রায় চার হাজার মানুষ।

 

  1. পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট পিলার ৮১টি।যা সেতুর দুই প্রান্তে থাকে। সড়কের জন্য ৪ টি প্রতি পাশে ২ টি করে।রেলের জন্য প্রতি পাশে ১ টি করে ২ টি ভায়াডাক্ট।

 

  1. পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা রয়েছে ৬০ ফুট।

 

  1. পদ্মা সেতুর পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট।

 

  1. পদ্মা সেতুর মোট পিলারের সংখ্যা ৪২টি।

 

  1. পাইল সংখ্যা-২৯৪ টি। ১ ও ৪২ নং পিলারে ১৬ টি করে মোট ৩২ টি পাইল বসানো হয়েছে।২২ টি পায়ারে সাতটি করে মোট ১৫৪ টি এবং ১৮ টি পিয়ারে ৬ টি করে মোট ১০৮ টি পাইল বসানো হয়

 

  1. মূল সেতুর স্প্যান ৪১ টি।প্রতিটি স্প্যান ১৫০ মিটার।

 

  1. রেল পথ থেকে নদ নদীর পানি পর্যন্ত ফাঁকা থাকবে ১৮ মিটার।

 

 

 

 

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে এর ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্পান ইতিমধ্যে বসানো সম্পন্ন হয়েছে, ৬.১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮.১০ মিটার প্রস্থ পরিকল্পনায় নির্মিত হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় সেতু।

বিশ্ব রেকর্ড করল পদ্মা সেতু

 পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার মধ্যেই ৫টি বিশ্ব রেকর্ড করে ফেলেছে পদ্মা সেতু।

 

পদ্মা সেতুর পাইলিং

 একটি হল- পদ্মা সেতুর পাইলিং। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীলরা বলছেনপদ্মা সেতুর খুঁটির নিচে সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীরে স্টিলের পাইল বসানো হয়েছে। এসব পাইল তিন মিটার ব্যাসার্ধের। বিশ্বে এখনও পর্যন্ত কোনো সেতুর জন্য এত গভীরে পাইলিং হয়নি এবং মোটা পাইল বসানো হয়নি।

 

ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং

 

দ্বিতীয় রেকর্ড, ভূমিকম্প থেকে পদ্মা সেতুকে টিকাতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ লাগানো হয়েছে।  যেই বিয়ারিংয়ের সক্ষমতা ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে  মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকে থাকতে পারবে পদ্মা সেতু।

তৃতীয় রেকর্ড, নদীশাসন। নদীশাসনে চীনের ঠিকাদার সিনোহাইড্রো কর্পোরেশনের সঙ্গে ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়েছে। এর আগে নদীশাসনে এককভাবে এত বড় দরপত্র বিশ্বে আর হয়নি।  ছাড়া পদ্মা সেতুতে পাইলিং  খুঁটির কিছু অংশে অতি মিহি (মাইক্রোফাইনসিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সিমেন্ট অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা হয়েছে।  ধরনের অতি মিহি সিমেন্ট সাধারণত ব্যবহার করা হয় না।

চতুর্থ রেকর্ডঃ পদ্মা সেতু বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রাস সেতু।এতদিন ট্রাস প্রযুক্তিতে নির্মিত সেতুর জায়গা দখল করে ছিলো ভারতে অন্ধ্র প্রদেশের গোদাবররী সেতু।এ সেতুতে স্প্যান ব্যবহার করা হয়েছে ২৭ টি।ট্রাস সেতু মূলত ভার বহন করবে বেশি কিন্তু নির্মান উপকরণের ব্যবহার হবে কম।এটার নকশা  দৃষ্টিনন্দন। 

 

এবং পঞ্চম রেকর্ডঃ কোন নির্মান কাজে বিশ্বে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে ভার্টিক্যাল আরসিসি বোর্ড পাইলের গ্রাউটিং ইনজেক্ট স্কিন ফিকশন  যা সেতুর দৃঢ়তা বৃদ্ধি করবে এবং নদীর তলদেশে বাহ্যিক ভাবে শক্তি প্রদান করবে। অপরটির স্টিল টিউবুলার ড্রিভেল পাইলে গ্রাউটিং ইনজেক্ট করে পাইলের তলদেশের স্কিন ফিকশন এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় 

 

পদ্মা সেতুতে রেললাইন

১৪ অক্টোবর ২০১৬ চীনের প্রেসিডেন্টে সি চিন পিং বাংলাদেশ সফরের সময়ই পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে অর্থায়নে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ২৭ এপ্রিল ২০১৮ চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে চীনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে 'পদ্মা সেতু রেল সংযোগ নির্মাণপ্রকল্পের

 ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৪ অক্টোবর ২০১৮ ‘পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। পদ্মা সেতুতে সংযোগ প্রকল্প ২টি : প্রকল্প- (ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-৮২.৩১ কিমিএবং প্রকল্প- (ভাঙ্গা নড়াইল-যশোর-৮৪.০১ কিমি) তবে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে মাওয়া থেকে পদ্মা বহুমুখী সেতুর ওপর দিয়ে রেললাইন জাজিরাশিবচরভাঙ্গা জংশন হয়ে ভাঙ্গা স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হবে। অর্থাৎ পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের মাধ্যমে ঢাকানারায়ণগঞ্জমুন্সিগঞ্জশরীয়তপুরমাদারীপুরফরিদপুরগোপালগঞ্জনড়াইল  যশোরের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হবে। পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের আওতায় মোট ২০টি রেলস্টেশন নির্মিত হবে। এর মধ্যে পুননির্মিত হবে ৬টি  নতুন হবে ১৪টি।

 

 

 

 
 

মোঃ জসীম উদ্দীন

জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর (সিভিল)

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

 

 

 

 

 

Comments

Sign in to comment