গ্রিক দার্শনিক, গণিতবিদ পিথাগোরাস / Greek philosopher, mathematician Pythagoras

 

মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পার করা প্রতিটা মানুষই পিথাগোরাসের উপপাদ্যের বদৌলতে পিথাগোরাসের নাম শুনে আসছে। কিন্তু পিথাগোরাসকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে সমস্যাটা হয় সেটা হচ্ছে  তার ব্যাপারে অধিকাংশ তথ্যেরই কোন লিখিত প্রমাণ নাই। যা কিছু পাওয়া যায় তা তার জন্মের শত বছর পর লিখিত। সেগুলো উপর যথেষ্ট ভরসা করা যায় কিনা তা দেখার বিষয়।

                                      

পিথাগোরাস ছিলেন গণিত শাস্ত্রের আদি পুরুষ। তিনি একাধারে গণিতজ্ঞ, চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। ৫৭০ খ্রিস্টপূর্বে এজিয়ান সাগরের পূর্ব উপকূল অর্থাৎ বর্তমান তুরস্কের কাছে সামোস দ্বীপে জন্মগ্রহন করেন। হিরোডটাস, Isocrates, এবং আরও অনেক প্রাচীন লেখকদের মতে, তার বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। Pythian, অ্যাপোলো এবং Aristippus-এর সাথে মিলিয়ে তার নাম রাখা হয়েছিল পিথাগোরাস। Iamblichus-এর গল্প অনুসারে Pythian দৈববাণী করেছিলেন যে পিথাগোরাসের গর্ভবতী মা অসম্ভব সুন্দর, প্রজ্ঞাবান ও মানুষের জন্য কল্যাণকর একজন সন্তান প্রসব করবে।  তার জন্মের তারিখ সঠিকভাবে জানা যায় না। Aristoxenus-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনি চল্লিশ বছর বয়সে Polycrates-এর স্বৈরশাসন থেকে বাচতে সামোস ত্যাগ করেন, সেই হিসাব অনুযায়ী তিনি ৫৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা তার কিছু পূর্বে জন্মগ্রহন করেছিলেন। যদিও প্রাচীন কালে তার বয়সের বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়, এ বিষয়ে সবাই একমত যে তিনি সম্ভবত ৭৫ থেকে ৮০ বছর বয়সে মারা যান।

আরেক বিখ্যাত গণিতবিদ থেলিসের নিকট তিনি গণিত শিক্ষা লাভ করেন । ২২ বছর বয়সে পিথাগোরাস থেলিসের উপদেশে অনুযায়ী প্রাচীন শহর মিশরে ভ্রমণ করতে যান। সেখানে তিনি তার জীবনের পরবর্তী ২২টি বছর কাটিয়েছিলেন । এ সময় সেখানে তিনি গাণিতিক ও আধ্যাত্মিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে শিক্ষা লাভ করেন। সেখানকার পিরামিড দেখে তিনি অভিভূত হয়ে যান। বিশাল পিরামিড নির্মাণের সময় যে গাণিতিক নিয়ম অনুসারে পাথরগুলোকে সাজানো হয়েছিল তা থেকেই তাঁর মনে প্রথম জ্যামিতি সম্পর্কে ধারণা আসে।
সম্ভবত ৫৬ বছর বয়সে পিথাগোরাস নিজের জন্মভূমি সামোসে ফিরে আসেন এবং গণিত ও জীবন সম্পর্কে নিজের দর্শন থেকে মানুষকে শিক্ষা দেন। মূলত তার নিজের চিন্তা, গণিত এবং প্রাচীন মিশরীয় অতীন্দ্রিয়বাদী কল্প-কাহিনীর উপর ভিত্তি করে তার দর্শন গড়ে উঠেছিল । তবে পিথাগোরাস সামোসে নিজের এই শিক্ষা বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেনি। মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি সামোস ছাড়তে বাধ্য হন। কারণ তার নতুন তত্ত্বে অনেক মানুষ অবিশ্বাস পোষণ করত এবং তারা ক্রমশই তার শত্রু হয়ে ওঠে। পরে তিনি সামোস ছেড়ে প্রাচীন গ্রীসের শহর ক্রটনে ( বর্তমানে ইতালির অংশ ) পাড়ি জমান ।  সেখানে একটি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ভ্রাতৃত্বমূলক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। তার অনুসারীরা তারই নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলত এবং তার দার্শনিক তত্ত্বসমূহ শিখত। সেখানে তিনি দর্শন ও গণিতশ্রাস্ত্রের উপর বক্তৃতা দিতেন। তিনি যখন বক্তৃতা দিতেন উচ্চ শ্রেণীর অনেকেই তার বক্তৃতা শুনতে আসত। তা ছাড়া তখনকার সময়ে মহিলাদের জন্য সাধারণ সভায় মহিলাদের অংশগ্রহন নিষিদ্ধ থাকলেও পিথাগোরাসের সভায় মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। কক্ষ সবসময় উৎসাহীদের দ্বারা পরিপুর্ণ থাকত। এই সম্প্রদায় ক্রোতোনের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে যা তাদের নিজেদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাড়ায়। এক সময় তাদের সভাস্থানগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পিথাগোরাসকে বাধ্য করা হয় ক্রোতোন ছেড়ে যেতে। ধারণা করা হয় জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি দক্ষিণ ইতালিরই আরেক স্থান মেতাপোন্তুমে কাটিয়েছিলেন।

পিথাগোরাসের অনুগামী ছিল তার গৃহস্বামী মিলো (Milo) এর সুন্দরী কন্যা থিয়ানো (Theano), তাকে তিনি পরবর্তীতে বিবাহ করেছিলেন। তিনি তার স্বামীর জীবনী রচনা করেছিলেন। কিন্তু সেটি পরবর্তীতে হারিয়ে যায়।

Diogenes Laertius প্রদত্ত তথ্য অনুসারে পিথাগোরাস অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান আহরণ করা আর সূফী দলগুলোর কাছ থেকে ইশ্বরের স্বরূপ সন্ধান করা। তিনি মিশর, ছাড়াও আরবদেশগুলো, ফোনেশিয়া, Judaea, ব্যাবিলন, ভারতবর্ষ পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। প্লুতার্ক তার On Isis and Osiris নামক বইতে জানান, মিশর ভ্রমণ কালে পিথাগোরাস Oenuphis of Heliopolis এর কাছ থেকে মূল্যবান নির্দেশনা পান। অন্যান্য প্রাচীন লেখকরাও তার মিশর ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন।

বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তিনি আবার ফিরে আসেন তার জন্মভূমি সামোসে। এরই মধ্যে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তার কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা আসতে থাকে। তিনি ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। তার শিষ্যদের বলা হতো পিথাগোরিয়ান।

গণিতবিদ্যায় তার বিখ্যাত আবিস্কার পিথাগোরাসের উপপাদ্য। এই উপপাদ্যটি হলো ইউক্লিডীয় জ্যামিতির অন্তর্ভুক্ত সমকোণী ত্রিভুজের তিনটি বাহু সম্পর্কিত একটি সম্পর্ক। পিথাগোরাসের নামানুসারে এ উপপাদ্যটির নাম করা হয়েছে।

পিথাগোরাসের উপপাদ্য: “কোন একটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের উপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল ঐ ত্রিভুজের অপর দুই বাহুর উপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান।“ মূলত পিথাগোরাস এই উপপাদ্য ব্যাবিলন থেকে শিখেছেন। কিন্তু এর এরূপ নামকরণের কারণ এই যে, তিনিই প্রথম উপপাদ্যটি প্রমাণ করেন। সংখ্যাতত্ত্ব এবং ত্রিমাত্রিক ও ক্ষেত্রফল সম্পর্কীয় জ্যামিতি শাস্ত্রে পিথাগোরাস অনেক বেশি অবদান রাখেন। অমূলদ সংখ্যা আবিষ্কৃত হয় পিথাগোরীয়ান তত্ত্ব থেকেই। প্রতিসাম্যের কারণে পাশা খেলায় ব্যবহৃত পাচ প্রকারের নিয়মিত আকৃতি পাওয়া যায় যাদের বলা হয় ‘প্লেটনিক সলিড’। এর প্রথম তিনটি পিথাগোরাস নিজে আবিষ্কার করেন এবং বাকি দুটি তার অনুসারীরা। সলিডগুলো হচ্ছে টেট্রাহেড্রন (চতুস্তলক), কিউব (ঘনক), অক্টাহেড্রন (অষ্টতলক), ডোডেকাহেড্রন (দ্বাদশতলক) এবং ইকোসাহেড্রন (বিংশতলক)

বর্তমানে পিথাগোরাস প্রধানত গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হলেও তার সময় বা তার মৃত্যুর ১৫০ বছর পর প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের সময়ও তিনি গণিত বা বিজ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন না। তিনি তখন দার্শনিক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। 

৪৯৫ খ্রিস্টপূর্বে ৭৫ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণ ইতালির মেতাপোন্তুমে মারা যান। পিথাগোরাসের জন্মের মত মৃত্যু নিয়েও আছে সংশয়। অধিকাংশের মতে তার মৃত্যু হয় ৭৫ বছর বয়সে ৪৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তবে কেউ বলেন তিনি ১০০ বছরেরও অধিক বেচে ছিলেন। তিনি কোথায় মারা গিয়েছিলেন তা নিয়েও ইতিহাসবিদগণ দ্বিধাবিভক্ত। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গ্রহণ করলে তিনি ক্রটন শহরে মারা যান। তার সমাধি সম্পর্কে ইতিহাসে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কুসংস্কার হোক কিংবা ভ্রান্ত বিশ্বাসই হোকএসব পিথাগোরাসকে অমর হবার পথে বাধা দিতে পারেনি। গণিত শাস্ত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি।

 


লেখক, 

ফারহা দিবা

সিনিয়র ইন্সট্রাকটর

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যাথমেটিক্স

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট

 

Comments

Sign in to comment