অ্যাবাকাস / Abacus

 

অনেক প্রাচীন সভ্যতা থেকে অ্যাবাকাসের ব্যবহার শুরু হয়। কোন সভ্যতা থেকে  যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয় তা নিয়ে প্রচুর মতবাদ আছে। অ্যাবাকাসকে প্রথম গণনা যন্ত্র হিসাবে ধরা হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালে ব্যাবিলনে এটি আবিস্কৃত হয় বলে ধারণা করা হয়। অনেক ইতিহাসবিদ বিভিন্ন ব্যাবিলনীয় লিপিতে অ্যাবাকাস ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা আছে। গ্রীক ইতিহাসবিদ হিরোডোতাস মিশরীয় সভ্যতায় এর ব্যবহার উল্লেখ করেন যেখানে এটিতে গণনা করা হত,  গ্রীক অ্যাবাকাসএর বিপরীত পদ্ধতিতে অর্থাৎ ডান থেকে বামে সরিয়েধারণা করা হয় খিষ্ট্রপূর্ব ৫০০ শতকে গ্রীক সভ্যতায় অ্যাবাকাস প্রচলিত ছিল যা অ্যাবাকি লিপিফলক (Counting Boardনামে পরিচিত।  ধরনের অ্যাবাকাস ছিল মুলত ব্রোঞ্জ নির্মিত লিপিফলক। লিপিফলকটিতে খাজঁকাটা এবং গোলাকৃতির গুটিগুলি গড়িয়ে যেতে পারত।  ধরনের অ্যাবাকি এক ধরনের বহনযোগ্য টেবিল এর উপরে নির্মিত করা হত যেন গণনায় বিঘন না ঘটিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। ১৮৪৬ সালে গ্রীক দ্বীপপুঞ্জ সালামিস  এরকম একটি টেবিল আবিস্কৃত হয় যা ব্যবহার করা হত খ্রীষ্ট্রপূর্ব ৩০০ শতকে। এটিই আবিস্কৃত সবচেয়ে পুরানো অ্যাবাকাস যা ’সালামিস এর টেবিল’ নামে পরিচিত লাভ করে।

বর্তমান যুগে সংখ্যার ধারণা ব্যাতিত গণনা করার কথা আমরা চিন্তা করেত পারি না। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন লিখিত সংখ্যা ধারণার উৎপত্তি হয়নি। তখন মানুষ হাতের আঙুল গণনা করার জন্য ব্যবহার করত  আঙুল ব্যবহার করে ১০ পর্যন্ত গণনা করা যেত। যখন ১০ (দুই হাতে সর্ব্বোচ্চ আঙ্গুলের সংখ্যাএর অধিক পরিাণ গণনা করার প্রয়োজন হলে তখন মানুষ পাথরগাছের বাকলপশুর হাড় ব্যবহার করে গণনার কাজ করত।

অ্যাবাকাস একটি প্রাচীন যন্ত্রযাতে একটি কাঠের ফ্রেমে বসানো তারে লাগানো গুটি ডানে বামে সরিয়ে গণনা করা হয়। ফ্রেমে বসানো একাট তারের উপর গুটিগুলি বসানো থাকে। তারগুলির সাথে লম্বভাবে একটি আড়াআড়ি দন্ড থাকে যা গুটিগুলিকে দুইভাগে ভাগ করে। প্রতিটি তার দশমিক ব্যবস্থার একটি ঘর নির্দেশ করে। সবচেয়ে ডান দিকের তারটি হল এককের ঘর। তার বাম পাশেরটি দশকের ঘরইত্যাদি। প্রতিটি তারে আড়াআড়ি দন্ডের নিচে পাচটি গুটি থাকেযা এক একক নির্দেশ করে। আড়াআড়ি দন্ডের উপরে অবস্থিত তারে দুইটি গুটি থাকেযেগুলির প্রতিটি পাচ একক নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ দশকের ঘরে নিচের পাচটি গুটির প্রতিটি ১০ নির্দেশ করে এবং উপরের দুইটি গুটি প্রতিটি ৫০ নির্দেশ করে। যে গুটিগুলিকে কোন সংখ্যার অংশ হিসেবে গণ্য করা হবেসে গুলিকে আড়াআড়ি দন্ডের উপরে বসানো হয়।

বিভিন্ন ধরণের অ্যাবাকাস এর গণনা বিধি বিভিন্ন রকমের। খাজ অথবা দন্ডের সংখ্যা এবং প্রত্যেকটিতে গুটির সংখ্যার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন  অ্যাবাকাস এর গণনা পদ্ধতি ভিন্নতা লাভ করে।

 

এমন একটি যন্ত্র যা বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে তাকে আমরা সাধারণত গণনা যন্ত্র বা ক্যালকুলেটার বলি। কিন্তু আদিম যুগে ব্যবহৃত  সকল গণনা যন্ত্র মুলত গণনার সময় ব্যবহার করত না, তারা বিভিন্ন সংখ্যা মনে রাখার কাজে এই গণনা যন্ত্রগুলি ব্যবহার করত । মানুষ নিজে যোগবিয়োগগুণভাগ প্রভৃতি সমস্যার সমাধান করত এবং বিভিন্ন সংখ্যা নির্দেশ করার জন্য ব্যবহার করত  সকল যন্ত্র। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে  সকল  যন্ত্রের উন্নতি সাধিত হয় এবং আরও বৃহৎ গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে ব্যবহার করা হয়। 

যিনি অ্যাবাকাস ব্যবহারে পারদর্শী তাকে অ্যাবাসিস্ট।বলা হয় । চীনে অ্যাবাকাসকে বলা হয় সুয়ান পানজাপানে অ্যাবাকাসকে বলা হয় সরোবানরাশিয়ায় বলা হয় স্কোসিয়া। গ্রিকরোমান এবং মিশরীয়রা অ্যাবাকাস ব্যবহার করলেও তাদের হিসাব পদ্ধতিতে শূন্যকে সূচনা করার কোন পদ্ধতি ছিল না। ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম শূন্যকে একটি চিহ্ন প্রদান করে হিসাব পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।এ সময় দশভিত্তিক হিসাব পদ্ধতি শুরু হলেও  অঙ্কগুলোর কোন স্থানিক মান ছিল না। ৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভারতবর্ষে দশভিত্তিক হিসাব প্রণালীতে অঙ্কগুলোর স্থানিক মান দেওয়া হয়।

অ্যাবাকাস এর ব্যবহারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও এখনও বিভিন্ন দেশে যেমন চীনজাপান এবং আফ্রিকার অনেক স্থানে গণনার কাজে অ্যাবাকাস ব্যবহৃত হয়। অ্যাবাকাস দিয়ে যোগবিয়োগগুণভাগ এর পাশাপাশি বর্গমূলঘনমূল প্রভৃতি অনেক জটিল সমস্যার সহজে সমাধান করা যায়। চীন এবং জাপানে শিশুদেরকে ছোটবেলায় অ্যাবাকাসের মাধ্যমে গণনার প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গণনা করা শিখলে শিক্ষার্থীরা যোগবিয়োগগুণভাগ প্রভৃতি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারদর্শিতা লাভ করে। সংখ্যার ধারণা স্বচ্ছ করা এবং গাণিতিক কল্পনা প্রতিভা বৃদ্ধিতে অ্যাবাকাস গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। আত্ববিশ্বাস বাড়াতেও এই পদ্ধতি বিশেষ ভাবে সাহায্য করে।   ছাড়াও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ’ক্রেনমার অ্যাবাকাস” তাদের শিক্ষাচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে।

ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অ্যাবাকাস পদ্ধতি। একটি সংস্থার উদ্যোগে অ্যাবাকাস  মেন্টাল অ্যারিথমেটিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিযোগীতায় অংশগ্রগণকারীদের মাত্র  মিনিটের মধ্যে ৭০টি জটিল গাণিতিক সমাধান করতে বলা হয়।  ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রগণকারীদের একাগ্রতাআত্ববিশ্বাসনিখুত পর্যবেক্ষণশোনার দক্ষতাস্মৃতির ধারণ ক্ষমতা  বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়ানো এবং সৃষ্টিশীলতা  কল্পনাশক্তির দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে।  কত দ্রুত  নির্ভুলভাবে সমাধান করতে পারে এটা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই  এই প্রতিযোগীতার আয়োজন। 

উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কেননাআত্ববিশ্বাস বাড়াতে  সৃষ্টিশীল লেখনী শক্তি বৃদ্ধিতে এই পদ্ধতি বিশেষভাবে সাহায্য করে।

 

ফারহা দিবা

সিনিয়র ইন্সট্রাকটর

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যাথমেটিক্স

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট

 

 

Comments

Sign in to comment