গণিতের রাজপুত্র - কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস / Prince of Mathematics - Carl Friedrich Gauss

 

আজ আমরা এমন একজন গনিণতবিদ নিয়ে আলোচনা করব, যিনি শুধু গণিতবিদ ছিলেন না, তিনি পদার্থবিদ ও জ্যোর্তিবিজ্ঞানীও। ১৭৭৭ সালে জার্মানির ’ব্রহনশোওয়িক (Braunschweig বা Brunswick)  নামক শহরে জন্মগ্রহন করেন।

তিনি হচ্ছেন ‘কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস’- বর্তমানে যাকে বলা হয় গণিতের রাজপুত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বড় গণিতবিদদের তালিকায় - কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস এক উজ্জ্বল নাম।

প্রথমে তার ছোটবেলার কিছু ঘটনা দিয়ে শুরু করি। তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন দরিদ্র পিতা-মাতার ঘরে। তার বাবা-মা ছিল নিরক্ষর। তাই তার জন্মদিন কবে সেটা কেউ জানতো না। কিন্তু গাউস তার জন্মদিন কবে সেটা জানার জন্য খুব আগ্রহী ছিল। তিনি তার জন্মদিনের হিসাব বের করবেনই। তখন তার মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলেন ১৭৭৭ সালের ইস্টারের উৎসবের ৩৯ দিন পরে এক বুধবারে তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন। বর্তমানে আমরা সহজেই হিসাব করে জন্ম তারিখ বের করতে পারি। কারন আমাদের হাতের কাছে আছে ক্যালকুটার বা মোবাইল । যার সাহায্যে কত তারিখ কি বার সহজেই বের কর যায়। কিন্তু গাউসের সময় তো আর মোবাইল-কম্পিউটার ছিল না। তাই তিনি ঐ ছোট বয়সেই নিজের জন্মদিন বের করার জন্যে বিশেষ এক গাণিতিক পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। তিনি প্রথমে বের করলেন ১৭৭৭ সালে ইস্টার কত তারিখে হয়েছিল। তারপরে বের করলেন সেই ইস্টার উৎসবের তারিখের থেকে ৩৯ দিন পরে কী বার পড়েছিল। তারপরে বের করলেন ঐ বারটা হতে বুধবার কয়দিনের দূরত্বে ছিলো। সেখান হতে বের করলেন বুধবারে কোন মাসের কত তারিখ ছিল। হিসেব করে তিনি পেলেন তাঁর জন্মদিন হচ্ছে ১৭৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল।

তার অসাধারণ প্রতিভা সম্বন্ধে বেশ কিছু গল্প প্রচলিত আছে। ছোটবেলা থেকে তিনি গণিতে অসম্ভব রকম প্রতিভাধর ছিলেন। কথিত আছে গাউস এর বয়স যখন মাত্র তিন বছর । তার বাবা বসে বসে বিশাল লিস্ট ধরে যোগ করছেন। গাউস এসে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি তার বাবার হিসাবের খাতার ভুল ধরে দেন । বাবা তখন হিসাব মিলিয়ে দেখেন আসলে তাই তার হিসাবে ভুল হয়েছে।

ছোটবেলায় তিনি খুব অস্থির প্রকৃতির ছিলেন । ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় তাকে যে অংকই করতে দেওয়া হত তা তিনি সাথে সাথেই করে ফেলতেন। তাই তার শিক্ষক তাকে ব্যস্ত রাখার জন্য একদিন তাকে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর যোগফল বের করতে বললেন। যাতে অনেকগুলো সংখ্যা লিখে যোগ করতে গাউসের বেশ কিছুটা সময় লাগে এবং কিছুটা সময় ব্যস্ত থাকে। শিক্ষককে ভুল প্রমাণ করে দুই মিনিটের মাথায় শিক্ষকের কাছে সমস্যার সমাধান দিয়ে আসলেন। এ সমস্যার সমাধান করতে গাউসের কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট লাগার কথা। এত কম সময়ে কিভাবে সমাধান করলেন?

এখন আমরা দেখবো কিভাবে এত দ্রুত সমস্যাটির সমাধান করেছে -

তিনি লক্ষ করলেন যে ধারাটি একেবারে সোজা – একবার উল্টো দিক থেকে লিখলে প্রতি জোড়া সংখ্যার যোগফল সমান হয়।

S=1+2+3+………+100
S=100+99+98+….+1
______________________________________________________________________________
2S=101+101+101+……..+101
or,2S=101.100
or, S= 50.101=5050

সায়েন্স ফিকশন লেখক ‘আইজ্যাক আসিমভ’ একবার এক লেখায় গাউসের জীবনের একটা ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তিনি কতটা গণিত পাগল ছিলেন। গাউসের প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন ১৮০৮ সালে। তাঁর স্ত্রীর যখন বুঝলেন মৃত্যু তার সন্নিকটে, তখন তিনি গাউসকে ডেকে আনতে একজনকে পাঠালেন । গাউস তখন গণিতের একটা সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বার্তাবাহককে বললেন, “ওকে বলো একটু অপেক্ষা করতে। আমি হাতের সমস্যাটা সমাধান করে নিই”।

কিশোর বয়সেই তিনি তার প্রথম যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। গণিতের খুব কম শাখা আছে যেখানে তার অবদান নেই। সংখ্যা তত্ত্ব, বীজগণিত, পরিসংখ্যান, গাণিতিক বিশ্লেষণ, ডিফারেন্সিয়াল জ্যামিতি, জিওফিজিক্স, স্থির তড়িৎ, জ্যোতির্বিদ্যা, ম্যাট্রিক্স থিওরি ও অপটিক্সে অসামান্য অবদান রেখেছেন তিনি।

১১ বছর বয়সে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল শেষ করার পর হাই স্কুলে (সেখানে বলা হয় জিমনাসিয়াম) যাবার জন্য গাউসের বাবাকে অনেক কষ্টে রাজি করাতে হয়েছিল। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তিনি হাই স্কুলে অসম্ভব ভাল করেন। গাউসের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা ব্রাউনশভিগের ডিউকের নজরে আসে।  মাত্র ১৪বছর বয়সে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে কলেজিয়াম ক্যারোলিনামে ভর্তি হন।  তিনি ১৭৯২ থেকে ১৭৯৫ পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়ন করেন। 

কলেজ শেষ করে ১৭৯৫তে গাউস গটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। কিন্তু গ্রাজুয়েশন শেষ না করেই ১৭৯৮ তে গটিনজেন ছেড়ে দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় গাউস বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্য নতুন করে আবিষ্কার করেন। কলেজে বইপত্র-জার্নাল সেরকম ছিল না। কিন্তু গটিনজেনে এসে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন। বইপত্র-জার্নাল নিয়ে তিনি অসীম আগ্রহে সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন । ১৭৯২ সালে অসাধারণ এ আবিষ্কার করেন। তাঁর বিখ্যাত প্রাইম নাম্বারের সূত্র তিনি সে সময় দিয়েছিলেন। শুধু প্রাইম নাম্বারের থিওরি নয়।  প্রায় দুই হাজার বছরের অসাধ্য একটি সমস্যার সমাধান করে (রুলার ও কম্পাস ব্যবহার করে সম-সতেরোভুজ আঁকা) সবাইকে অবাক করে দেন। জানা যায়, ১৭৯৬ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে এত বেশি আর ঘন ঘন গাণিতিক ধারণা তার মাথায় আসত যে সবগুলো লিখে রাখারও সময় হত না । কিন্তু তিনি গবেষণাপত্র প্রচার ও প্রকাশের পেছনে তত মনোযোগী ছিলেন না । তিনি তাঁর জীবনে করা অনেক গবেষণাই জনসম্মুখে প্রকাশ করেননি। যেগুলো করেছেন সেগুলোতেও দেখা গেছে প্রাপ্ত ফলাফল তিনি কিভাবে পেয়েছেন তার কোন হদিস নেই। ফলাফলটা প্রমাণ হবার পরেই তিনি এর আগের সমস্ত লাইন মুছে ফেলেছেন, শুধু প্রমাণিত ফলাফলটা রেখে দিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন বেশ চাপা ও খুঁতখুঁতে স্বভাবের। তিনি সারা জীবনে মাত্র একবার ১৮২৮ সালে বার্লিনে বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। 

ইতিহাসবিদ ‘এরিক টেম্পল বেল’ বলেন, “গাউস যদি তার অধিকাংশ কাজগুলো প্রকাশ করতেন, তবে গণিতশাস্ত্র সেই সময়েই আরো ৫০ বছর এগিয়ে যেত।“

 

১৭৯৮ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে কার্ল ফ্রেডরিক গাউস তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বই, ম্যাগনাম অপাস, Disquisitiones Arithmeticae (ল্যাটিন – Arithmatical Investigations) লেখেন। ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয় বইটি। এটি গণিতের ইতিহাসে সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে এক অনবদ্য বই। সংখ্যাতত্ত্বের উপর লেখা এ বই গণিতের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে। এ বইয়ে তিনি কনগ্রুয়েন্স বা অনুসমতার জন্যে একটি নতুন চিহ্নের ব্যবহার প্রচলন করেন এবং এর মাধ্যমে ভাগশেষ পাটীগণিতের পরিষ্কার উপস্থাপনা করেন। আমরা যেটাকে বলি মডুলাস অ্যারিথমেটিক।

১৮৫৫ সালে জার্মানির ‘গ্যেটিঙ্গেন’ নামক স্থানে মারা যান গণিতের এই রাজপুত্র। দু'জন ব্যক্তি তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে প্রশংসাবাক্য পাঠ করেন, একজন গাউসের জামাতা হাইনরিখ এওয়াল্ড এবং অন্যজন উলফগ্যাং সার্টরিয়াস ফন ভালটারশসেন, যিনি ছিলেন গাউসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তার জীবনীকার। গবেষণার জন্য গাউসের মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল । পরে গবেষণা করে পাওয়া যায় তাঁর মস্তিষ্কের ওজন ১৪৯২ গ্রাম এবং মস্তিষ্কের সেরিব্রাল এলাকার ক্ষেত্রফল ২১৯৫৮৮ বর্গ মিলিমিটার বা ৩৪০.৩৬২ বর্গ ইঞ্চি। মস্তিষ্কের কিছু কিছু স্থানে স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশিই প্যাঁচানো আকৃতি খুজে পাওয়া যায়, যেটা শুধুমাত্র গাউসের অনন্য মেধাকেই নির্দেশ করে।

 

 “Mathematics is the queen of sciences and number theory is the queen of mathematics.” – গাউস  

 

 


 

ফারহা দিবা

সিনিয়র ইন্সট্রাকটর

ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যাথমেটিক্স

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট







 

 


 

Comments

Sign in to comment